Uncategorized

গান-বাজনা শোনার ক্ষতি, বাঁচার ১০ উপায় এবং সাবলিমিনাল

গান-বাজনা শোনার ক্ষতি, বাঁচার ১০ উপায় এবং সাবলিমিনাল
▬▬▬▬♫◈♫▬▬▬▬
❑ প্রশ্ন: গান-বাজনা শোনার ক্ষতিকর দিক সমূহ কী? এক দ্বীনী বোন গান শুনেন। উনি শুনতে চায় না তবুও না শুনে থাকতে পারে না। এখন সে কী করতে পারে?
উত্তর:
দুআ করি, মহান আল্লাহ উক্ত বোনকে গান-বাজনা থেকে হেফাজত করুন এবং তাকে হেদায়েতের পথে অবিচল রাখুন। আমিন।
❑ গান-বাজনা শোনার ক্ষতিকর দিক সমূহ:
➧ ইমাম ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন,
” الغناء من مكايد الشيطان ومصايده التي يكيد بها من قل نصيبه من العلم والعقل والدين ويفسد بها قلوب الجاهلين والمبطلين. يبعد به القلوب عن القرآن، ويجعلها عاكفة على الفسوق والعصيان. هو قرآن الشيطان، والحجاب الكثيف عن الرحمن”.إغاثة اللهفان من مصائد الشيطان لابن قيم الجوزية
“গান হল শয়তানের ফাঁদ। সে এর মাধ্যম কম জ্ঞান, কম বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারী লোকদেরকে শিকার করে, অজ্ঞ ও ভ্রান্ত লোকদের অন্তরগুলো নষ্ট করে, মনকে কুরআন থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং পাপাচারও আল্লাহর নাফরমানিতে তাদের মনকে নিবিষ্ট করে দেয়। এটা হল, শয়তানের কুরআন এবং রহমান (দয়াময় আল্লাহ) এর মাঝে শক্ত আবরণ।”
➧ এ ছাড়াও গান-বাজনা শোনার অনেক ক্ষতিকর দিক রয়েছে। যেমন: গান মানুষকে পথভ্রষ্ট করে এবং আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, অন্তরে প্রলেপ পড়ে যায়, মনের মধ্যে কপটতা সৃষ্টি করে, কু-প্রবৃত্তি জাগ্রত করে, অবৈধ প্রেম-ভালবাসা উদ্রেক করে এবং জিনা-ব্যভিচার ও অশ্লীলতা দিকে প্ররোচিত করে। ফুযাইল ইবনে ইয়াজ রহ. বলেন, “الغناء رقية الزنا “গান হল, জিনার মন্ত্র।” (অর্থাৎ গান মানুষের মনের মধ্যে মন্ত্রের মত প্রভাব সৃষ্টি করে এবং জিনা-ব্যভিচারের সুপ্ত বাসনা জাগ্রত করে)
❑ গান-বাজনা শোনা কি বড় গুনাহের অন্তর্ভুক্ত?
গান বাজনা শোনা নি:সন্দেহে আল্লাহর নাফরমানির অন্তর্ভুক্ত। কোন কোন আলেম কবিরা (বড় গুনাহ) এর অন্তর্ভুক্ত করেছেন আর কেউ বলেছেন, সগিরা গুনাহ (ছোট গুনাহ)। তবে কেউ যদি গান-বাজনা শুনতে আসক্ত থাকে অথবা নিয়মিত শুনে বা এটিকে তুচ্ছজ্ঞান করে তাহলে তা কাবিরা (বড়) গুনাহে রূপান্তরিত হবে। এ ব্যাপারে সকলেই একমত। সর্তকতার বিষয় হল, এটিকে সগিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করা হলেও কেউ যদি এর প্রতি আসক্ত থাকে তাহলে ক্রমান্বয়ে তা তাকে কবিরা বা বড় বড় গুনাহের দিকে টেনে নিয়ে যেতে পারে। গান শোনায় অভ্যস্ত ব্যক্তিদের অন্তরে মরিচা পড়ে যায়, তাদের অন্তরের নুর নিভে যায়। ফলে একপর্যায়ে তাদের অন্তরে কুরআন তিলাওয়াত, ইসলামি আলোচনা শোনার প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়। এভাবে সে আস্তে আস্তে ইসলামের হুকুম আহকামের প্রতি অবজ্ঞা করতে শুরু করে। আল্লাহ ক্ষমা করুন। এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আগেই গানবাজনায় অভ্যস্ত ব্যক্তিদের তওবা করে ফিরে আসা জরুরি।
❑ গান-বাজনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য ১০টি করণীয় ও দিক নির্দেশনা:
নিম্নে গান-বাজনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য ১০টি করণীয় ও দিক নির্দেশনা তুলে ধরা হল:
❖ ১) কেউ যদি সত্যি গান-বাজনা শোনা থেকে নিবৃত হতে চায় তাহলে হৃদয়ে এই বিশ্বাস প্রথিত করা জরুরি যে, ইসলামে গান-বাজনা হারাম। আর কেউ যদি জেনে-বুঝে হারাম কাজে লিপ্ত হয় তাহলে সে যেন নিজেকে জাহান্নামের শাস্তির দিকে ঠেলে দেয়। সাথে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে, ইসলাম যা কিছু নিষিদ্ধ করেছে তাতে অবশ্যই মানুষের ক্ষতি রয়েছে। তাতে কোনও কল্যাণ থাকলে অবশ্যই হারাম করা হত না।
❖ ২) ‘গান-বাজনা হারাম’ এ বিশ্বাস পোষণের পর যা করণীয় তা হল, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির অর্জন এবং আখিরাতে প্রতিদান পাওয়ার উদ্দেশ্যে তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করার জন্য মনের মধ্যে সুদৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। কারণ সুদৃঢ় সিদ্ধান্তের কাছে আল্লাহর ইচ্ছায় প্রবৃত্তির হাতছানি ও শয়তানের কূটকৌশল পরাভূত হতে বাধ্য।
❖ ৩) এ পথ থেকে ফিরে আসার জন্য মহান রবের কাছে আন্তরিকভাবে দুআ করা। কারণ আল্লাহ মানুষের অন্তরের নিয়ন্ত্রণকারী। তিনি যদি মনকে হারাম থেকে ঘুরিয়ে দেন তাহলে তা আর সে দিকে মোড় নিবে না।
❖ ৪) গান-বাজনার উপকরণ ঘর থেকে বের করা এবং যেখানে গান-বাজনা হয় সেখানে না যাওয়া।
❖ ৫) অধিক পরিমাণে কুরআনুল কারিম তেলাওয়াত করা। সম্ভব হলে কুরআন খতম দেয়া। পাশাপাশি কুরআনের তরজমা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জানা, কুরআন মুখস্থ করা এবং ভালো ভালো কারীদের তিলাওয়াত শোনা।
❖ ৬) প্রচুর পরিমাণে জিকির-আজকারের মাধ্যমে জিহ্বাকে সতেজ রাখা। কারণ জিকির দ্বারাই অন্তরে প্রশান্তি অর্জিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُم بِذِكْرِ اللَّـهِ ۗ أَلَا بِذِكْرِ اللَّـهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ
“যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর জিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে। জেনে রাখ, আল্লাহর জিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়।” (সূরা রা’দ: ২৮) সুতরাং যারা হতাশা, অস্থিরতা, ব্যর্থতা ইত্যাদি থেকে বাঁচার জন্য বিরহের গান শোনে বা মিউজিক সহ সাবলিমিনাল শুনে মানে শান্তি খোঁজে তাদের উচিৎ, এসব হারাম থেকে তওবা করা এবং আল্লাহর জিকিরের প্রতি মনোযোগী হওয়া। তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই অন্তরে অনাবিল প্রশান্তি লাভ করবে।
❖ ৭) দীনি ইলম (ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান) অন্বেষণ করা, ভালো আলেমদের লিখিত বই-পুস্তক পাঠ করা, তাদের শিক্ষণীয় বক্তৃতা বা যে কোনও উপকারী বিষয় শোনা।
❖ ৮) হৃদয়ে এই অনুভূতি জাগ্রত করা যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে কেবল তাঁর দাসত্ব করার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার মধ্যেই আমাদের কল্যাণ রয়েছে। এর বাইরে গেলেই আমাদের জন্য অনেক ক্ষতি ও অকল্যাণ রয়েছে।
❖ ৯) মনের মধ্যে গান শোনার ইচ্ছা জাগ্রত হলেই “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাত্বানির রাজীম” (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি) পাঠ করা।
❖ ১০) গানের ক্ষতিকর দিকগুলো স্মরণ করা। (যেগুলো প্রথম দিকে উল্লেখিত হয়েছে)
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের হারাম ও তাঁর অসন্তুষ্টি মূলক কার্যক্রম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
❑ প্রশ্ন: পড়াশোনায় মনোযোগ বৃদ্ধি, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল বা ভালো কোন নিয়তে ইউটিউব থেকে ‘সাবলিমিনাল’ শোনা কি জায়েজ?
উত্তর:
সাধারণত: সাবলিমিনাল (Subliminal)গুলোতে বিভিন্ন ধরণের গান ও মিউজিকের ব্যবহার থাকে। গান-বাজনা বা মিউজিক থাকলে তা শুনা জায়েজ নাই। কারণ ইসলামে এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে যদি গান-বাজনা মুক্ত অডিও হয় যেমন: সাগরের ঢেউ, পাখির ডাক, মৃদুমন্দ বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টি পতনের ছন্দ বা বিশেষ কিছুর আওয়াজ ইত্যাদি তাহলে যদি এগুলো শুনার দ্বারা মানসিকভাবে কোনও উপকার লাভ হয় তাহলে বৈধ কাজের উদ্দেশ্যে তা শুনতে কোনও অসুবিধা নেই ইনশাআল্লাহ। কারণ-এটি একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার যা মানুষের অবচেতন মনে প্রভাব ফেলে। আর ইসলামের একটি মূলনীতি হল, মানুষের জন্য উপকারী কোনও কিছুকেই হারাম বলা যাবে না যতক্ষণ না তাতে ইসলামি শরিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক কিছু থাকে। তবে আল্লাহর জিকির, দুআ-তসবিহ, ইস্তিগফার, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি পাঠ ও শ্রবণ মুমিনের হৃদয়কে আরও বেশি আলোড়িত ও প্রভাবিত করে তাতে কোনও সন্দেহ নাই।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬♫◈♫▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দু্ল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *