Uncategorized

গোপন ইবাদতের মর্যাদা


▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
প্রশ্ন: নিজের আমল ও ইবাদত-বন্দেগি গোপন রাখার ফজিলত কি? এর বিশেষ কোন মর্যাদা আছে কি?
উত্তর:
কিছু ইবাদত রয়েছে যেগুলো গোপন রাখার সুযোগ নাই। বরং প্রকাশ করাই জরুরি। যেমন: পুরুষদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে সালাত আদায় করা, মক্কায় গিয়ে হজ্জ ও উমরা সম্পাদন করা, যাকাত দেয়া ও দান-সদকা করা (কারণ কমপক্ষে যাকাত ও দান গ্রহীতা এই ইবাদত সম্পর্কে জানলো), সালাতের জন্য আজান দেয়া, আল্লাহর পথে কাফেরদের সাথে জিহাদ করা, আল্লাহর পথে মানুষকে দাওয়াত দেয়া, সৎকাজের আদেশ-অসৎকাজের নিষেধ করা ইত্যাদি। এসব ইবাদত গোপন করার সুযোগ নাই। তবে এক্ষেত্রে অন্তরকে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালিস করা আবশ্যক যেন সেখানে দুনিয়ার কোন স্বার্থ, লোভ, লোক দেখানো মনোভাব বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার মনোবাসনা বাসা না বাধে। অন্যথায় তা নেকির পরিবর্তে গুনাহ অর্জনের মাধ্যমে পরিণত হবে। (আল্লাহ ক্ষমা করুন)
❐ গোপন ইবাদতের মর্যাদা:
যে সকল ইবাদত আদতেই গোপন করা সঙ্গত বা বৈধ নয় সেগুলো ছাড়া অন্যান্য সকল নফল ইবাদত যথাসম্ভব গোপনে ও নিভৃতে-নির্জনে সম্পাদন করা উত্তম। যেমন: নিভৃতে দুআ, তাসবিহ ও জিকির-আজকার করা, তাহাজ্জুদ, চাশত (সালাতুয যোহা), ওজুর দু রাকআত নফল সালাত, প্রতি আরবি মাসের আইয়ামে বিয (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) বা মাসের যে কোনও সময় তিনটি রোজা, প্রতি সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার নফল রোজা, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি।
এর অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন:
● ক. গোপন ইবাদত অন্তরে রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা বা লোক দেখানো মনোভাব) সৃষ্টি না হওয়ার জন্য খুব সহায়ক।
আর এ কথা অজানা নয় যে, অন্তরে রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব সৃষ্টি হলে তাতে উক্ত ইবাদতটি শুধু বাতিল হয় না বরং তা ছোট শিরকে রূপান্তরিত হয়। (আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি)
হাদিসে এসেছে, মাহমুদ ইবনে লাবিদ রা. বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
« إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ», قَالُوا: وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ ؟ قَالَ: «الرِّيَاءُ، يَقُولُ اللَّهُ -عَزَّ وَجَلَّ- لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ – إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ-: اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً »
“আমি তোমাদের ওপর যা ভয় করি তার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে শিরকে আসগর (ছোট শিরক)। তারা বলল: হে আল্লাহর রাসূল শিরকে আসগর কি? তিনি বললেন: “রিয়া (লোক দেখানো আমল)। আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাদেরকে (রিয়াকারীদের) বলবেন, যখন মানুষকে তাদের আমলের বিনিময় দেয়া হবে: তোমরা তাদের কাছে যাও যাদেরকে তোমরা দুনিয়াতে দেখাতে, দেখ তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কি না”। [মুসনাদে আহমদ- হাদিসটি সহিহ]
অন্য হাদিসে এসেছে,
مَن عَمِلَ عَمَلًا أشْرَكَ فيه مَعِي غيرِي، تَرَكْتُهُ وشِرْكَهُ
“যে ব্যক্তি কোন একটি আমল করল এবং তাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করল, আমি তাকে ও তার আমলকে প্রত্যাখ্যান করি।” (সহিহ মুসলিম)
● খ. গোপন ইবাদত কারীর জন্য হাশরের ময়দানে আরশের ছায়াতলে আশ্রয় লাভের সুযোগ:
এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদিসটি প্রযোজ্য (৬ ও ৭ নং পয়েন্ট):
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلاَّ ظِلُّهُ الإِمَامُ الْعَادِلُ، وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ رَبِّهِ، وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي الْمَسَاجِدِ، وَرَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ، وَرَجُلٌ طَلَبَتْهُ امْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ‏.‏ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ أَخْفَى حَتَّى لاَ تَعْلَمَ شِمَالُهُ مَا تُنْفِقُ يَمِينُهُ، وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ ‏”‏‏.‏
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে দিন আল্লাহর রহমতের ছায়া ব্যতীত অন্য কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর ছায়ায় (অন্য বর্ণনায় তাঁর আরশের ছায়ায়) আশ্রয় দিবেন। যথা:
১. ন্যায়পরায়ণ শাসক,
২. সে যুবক যার জীবন গড়ে উঠেছে তার রবের ইবাদতের মধ্যে,
৩. সে ব্যক্তি যার অন্তর মসজিদের সাথে লেগে রয়েছে,
৪. সে দু ব্যক্তি যারা পরস্পরকে ভালোবাসে আল্লাহর ওয়াস্তে। তারা একত্র হয় আল্লাহর জন্য এবং পৃথকও হয় আল্লাহর জন্য,
৫. সে ব্যাক্তি যাকে কোন উচ্চ বংশীয় রূপসী নারী আহ্বান জানায়, কিন্তু সে এ বলে তা প্রত্যাখ্যান করে যে, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করি’,।
৬. সে ব্যাক্তি যে এমন গোপনে দান করে যে, তার ডান হাত যা খরচ করে বাম হাত তা জানে না ,
৭. সে ব্যাক্তি যে নির্জনে আল্লাহর জিকির করে, ফলে তার দু’চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হয়। [সহীহ বুখারি (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ১০/ আযান (كتاب الأذان) |৪২৮। অনুচ্ছেদ: যিনি সালাতের অপেক্ষায় মসজিদে বসে থাকে তার এবং মসজিদের ফযিলত।]
● গ. গোপন ইবাদত অন্তরের পবিত্রতা, নিয়তের পরিশুদ্ধতা, ইবাদতে সত্যবাদিতা, এবং আল্লাহর প্রতি তাকওয়া বা আল্লাহভীতির প্রমাণ।
● ঘ. গোপন ইবাদত আল্লাহর সাথে বান্দার ঘনিষ্টতা ও সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিরাট মাধ্যম।
❐ গোপন ইবাদত কখন প্রকাশ করা যায়?
যদি নফল গোপন ইবাদত প্রকাশ করায় দীনের কোনও উপকার হয়, মানুষের মধ্যে ইবাদত করার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয় বা লোকজনকে শিক্ষা দেয়া উদ্দেশ্য হয় তখন তা দোষণীয় নয়। যেমন:
লোকজনের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে দান করা। কেউ যদি এই নিয়তে প্রকাশ্যে দান করে যে, অন্যান্য লোকজন তাকে দেখে উৎসাহিত হবে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আহ্বানে সাহাবিগণ প্রকাশ্যে দান করার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করেছেন।
পুরুষগণ যদি বাড়িতে স্ত্রী-পরিবারের সামনে সুন্নত, নফল ইত্যাদি পড়ে তাহলে তা উত্তম। হাদিসে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর অন্যতম একটি উপকার হল, তাকে দেখে স্ত্রী ও সন্তান সন্তুতি ইবাদত শিখতে পারবে এবং তারা অনুপ্রাণিত হবে।
কেননা আল্লাহ তাআলা মূলত: বান্দার নিয়ত অনুযায়ী আমলের প্রতিদান দিয়ে থাকেন।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “সমস্ত কাজের ফলাফল নির্ভর করে নিয়তের উপর আর প্রত্যেক ব্যক্তি যা নিয়ত করেছে তাই পাবে।” [সহিহ বুখারি, হা/১ ও মুসলিম হা/১৯০৭]
আল্লাহ তাআলা আমাদের নেক আমলগুলোকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করার এবং রিয়া বা লোক দেখানো মনোভাব থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *