Uncategorized

শিশুদের প্রতি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্নেহ, মমতা ও একগুচ্ছ স্নিগ্ধ ভালবাসা


▬▬▬◍❂◍▬▬▬
প্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ ছিলেন এক মহান আদর্শ মানব। তিনি শুধু নবুওয়ত ও রিসালাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে নয় বরং সত্যিকার মানুষ হিসেবে তার মধ্যে যে মানবিক অনন্য সাধারণ গুণাবলীর সমাবেশ ঘটেছিলো তা নি:সন্দেহে বিশ্ববাসীর অনুসরণীয়-অনুকরণীয়। এ পর্যায়ে শিশুদের সাথে তাঁর কোমল আচরণ এবং স্নেহ, মমতা ও ভালবাসার এক অপূর্ব খণ্ড চিত্র দেখব ইনশাআল্লাহ।
◈ ১) জাবের ইবনে সামুরাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে ফজরের সালাদ আদায় করলাম। অতঃপর তিনি বাড়ির দিকে বের হলে আমিও তার সাথে বের হলাম। পথিমধ্যে তার সাথে কিছু বাচ্চার সাক্ষাৎ হল। তিনি তাদের এক এক করে প্রত্যেকের উভয় গালে হাত বুলাতে লাগলেন।
মাহমুদ রা. বলেন, তিনি আমার উভয় গালে হাত বুলালেন। আমি তার হাতের শীতল সুগন্ধিময় পরশ উপলব্ধি করলাম-যেন তার হাতের সাথে সুগন্ধি ব্যবসায়ীর সামগ্রীর ছোঁয়া লেগেছে।” (সহিহ মুসলিম)
◈ ২) উসামার প্রতি তাঁর ভালোবাসা:
উসামা ইবনে যায়েদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে ধরে তার এক রানে বসাতেন আর হাসানকে বসাতেন অন্য রানে। অতঃপর তাদের একত্র করতেন এবং বলতেন, ‘হে আল্লাহ, তুমি তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, কেননা আমি তাদের প্রতি দয়া করি।” (সহিহ বুখারি)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, “হে আল্লাহ, আমি তাদের ভালোবাসি। সুতরাং আপনিও তাদের ভালবাসুন।” (সহিহ বুখারি)
◈ ৩) মাহমুদ ইবনে রবী এর সাথে তাঁর কৌতুক:
মাহমুদ রা. বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এক বারের পানি ছিটানোর কথা; ‘তিনি আমার চেহারায় বালতি থেকে পানি ছিটিয়েছেন। তখন আমার বয়স ছিল পাঁচ বছর যা আমার এখনও মনে আছে।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
তিনি এটা করেছেন কৌতুক বশত: বা বরকতস্বরূপ- যেমনটি তিনি সাহাবীদের সন্তানদের সাথে করতেন।
শাইখ ইবনে বায রহ. বলেন, “এটা কৌতুক ও উত্তম চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত।”
◈ ৪) শিশুদেরকে আদরের চুমু দেয়া:
◍ ক. আবু হুরায়রাহ রা. বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ইবনে আলীকে চুম্বন করেন তখন তার নিকট আকরা ইবন হাবেস তামীমী রা. বসা ছিল। আকরা রা. বললেন, “আমার ১০ সন্তান আছে। তাদের কাউকেই আমি চুম্বন করি না।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেন, “যে দয়া করে না, তার প্রতি দয়া করা হয় না।” (সহিহ বুখারি)
◍ খ. আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কিছু গ্রাম্য লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এসে বলল, “তোমরা তোমাদের বাচ্চাদের চুমো খাও। আমরা তাদের চুমো খাই না।” নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমার অন্তরে দয়া উদ্রেক করা আমার পক্ষে সম্ভব নয় যদি আল্লাহ তা ছিনিয়ে নিয়ে থাকেন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
◈ ৫. হাসান ও হুসাইন রা. এর সাথে তাঁর আদর পূর্ণ ব্যবহার:
◍ ক. হাসান ও হুসাইন রা. রাসূলের সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিলেন। এ ব্যাপারে ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাদের সম্পর্কে বলতে শুনেছি, “তারা আমার জন্য পৃথিবীর সুগন্ধিময় দুটি ফুল।” (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আমাকে তাদের দান করেছেন এবং তাদের দিয়ে সম্মানিত করেছেন। সন্তানদেরকে চুম্বন করা হয় এবং সুঘ্রাণ নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে তাদেরকে সুগন্ধময় ফুলের সাথে তুলনা করা হয়েছে।
◍ খ. আবু বাকরাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মিম্বারে আরোহণ অবস্থায় তার খুতবা শুনেছি, আর হাসান তার পাশে ছিল। তিনি একবার মানুষের দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার তার দিকে তাকাচ্ছেন এবং বলেছেন, “নিশ্চয়ই আমার এ সন্তান একজন নেতা হবে। সম্ভবত: আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে মুসলিমদের বিশাল দু দলের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন” (সহিহ বুখারি)
পরবর্তীতে আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়ে মুআবিয়া রা. ও তার সাথীদের এবং আলী ইবনে আবি তালেব রা. এর অনুসারীদের ও তার সাথীদের মাঝে মীমাংসা করেন। তিনি খেলাফতের দায়িত্ব মুআবিয়া রা. এর জন্য ছেড়ে দেন। ফলে আল্লাহ তআলা তাঁর দ্বারা মুসলিমদেরকে রক্তপাত থেকে রক্ষা করেন।
◍ গ. বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি হাসান ইবনে আলী রা.কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাঁধে দেখেছি এবং বলতে শুনেছি, “হে আল্লাহ, আমি তাকে ভালোবাসি। অতএব, আপনিও তাকে ভালবাসুন।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
◈ ৬) সেজদা অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পিঠে বাচ্চার আরোহণ:
শাদ্দাদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হলেন মাগরিব বা এশার নামাজ পড়ানোর জন্য। হাসান রা. বা হুসাইন রা.কে তিনি বহন করছিলেন। অতঃপর তিনি সামনে গিয়ে তাকে রাখলেন। এরপর তিনি নামাজের মধ্যে একটি দীর্ঘ সেজদা করলেন।
আমার পিতা বলেন যে, ‘আমি আমার মাথা উত্তোলন করে দেখতে পেলাম সেজদা রত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাঁধে একটি শিশু। আমি আবার সেজদায় ফিরে এলাম। যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম নামাজ সম্পন্ন করলেন তখন লোকেরা বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, নিশ্চয়ই আপনি নামাজের মধ্যে একটা দীর্ঘ সেজদা করেছেন-যে কারণে আমরা মনে করেছিলা যে, হয়তো কিছু একটা ঘটেছে অথবা আপনার কাছে ওহী এসেছে।”
তিনি বললেন, “এগুলোর কোনটাই হয় নি। তবে আমার সন্তান (হাসান রা./ হুসাইন রা) আমার পিঠে আরোহণ করেছিলো। তাই আমি তার চাহিদা পূরণ না করে তাড়াহুড়ো করতে অপছন্দ করলাম।” (সুনানে নাসায়ী, মুসনাদে আহমদ)
◈ ৭) নামাজরত অবস্থায় যয়নব রা. এর মেয়েকে কোলে তুলে নেয়া:
আবু কাতাদা থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাজ পড়া অবস্থায় উমামা বিনতে যয়নবকে বহন করছিলেন। যখন তিনি সেজদা করতেন তখন তাকে রেখে দিতেন আর যখন দাঁড়াতেন তখন তাকে কোলে তুলে নিতেন।” (সহিহ বুখারি)
◈ ৮) শিশু বাচ্চারা কাঁদার সময় তাঁর নামাজ পড়া সংক্ষিপ্ত করা:
তিনি কোনও শিশু বাচ্চার কাঁদার আওয়াজ শুনলে সালাত সংক্ষিপ্ত করতেন। এ ব্যাপারে আবু কাতাদাহ রা. তার পিতা থেকে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যখন আমি সালাতে দাঁড়াই তখন ইচ্ছা থাকে নামায দীর্ঘ করব। কিন্তু যখন কোনও শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনি, তখন তার মায়ের কষ্ট হবে ভেবে আমি নামাজ সংক্ষেপ করি।” (সহিহ বুখারি)
◈ ৯) উম্মে খালেদের সাথে হাবশী ভাষায় কৌতুক:
এ ব্যাপারে উম্মে খালেদ বিনতে খালেদ ইবনে সাঈদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি আমার বাবার সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এলাম। তখন আমার গায়ে হলুদ রঙ্গের জামা ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘ছানাহ! ছানাহ!’’ এটি হাবশী ভাষার শব্দ যার অর্থ, চমৎকার! চমৎকার!
তিনি বলেন, “অতঃপর আমি নবুওয়তের মোহর নিয়ে খেলা করতে গেলাম। আমাকে আমার পিতা ধমক দিলেন।
কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তাকে ধমক দিও না।”
অতঃপর দুআ বললেন,
أَبلِي وأَخلِقي ثُمَّ أبلِي وَأخلِقي ثُمَّ أبلي وَأخلِقي
ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর, অতঃপর আবার ক্ষয় কর এবং জীর্ণ কর।’
আব্দুল্লাহ বলেন, অতঃপর সে মহিলা অনেকদিন জীবিত ছিল। এমনকি তার কথা বর্ণনা করা হতো (যে ওমুক দীর্ঘজীবী হয়েছে)। (সহিহ বুখারি)
অর্থাৎ বর্ণনাকারী তার দীর্ঘ জীবনের কথা বুঝিয়েছেন। অনেকে বলেছেন, উম্মে খালেদের মতো আর কেহ এত দীর্ঘ জীবন লাভ করে নি।
◈ ১০) আবু উমায়ের সাথে তার কৌতুক:
আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে প্রিয় ছিল আমার এক ভাই, তার নাম আবু উমায়ের। আমার মনে আছে, সে যখন এমন শিশু যে মায়ের বুকের দুধ ছেড়েছে মাত্র। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কাছে আসতেন এবং বলতেন, “হে আবু উমায়ের, কি করেছে তোমার নুগায়ের?’
নুগায়ের হল এমন একটি ছোট পাখি যার সাথে আবু উমায়ের খেলা করত। নুগায়ের মারা গিয়েছিল। (সহিহ বুখারি)
◈ ১১) শিশু বাচ্চাদের সালাম দেয়া:
আনাস ইবনে মালেক রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি শিশু বাচ্চাদের নিকট দিয়ে অতিক্রম করার সময় তাদের সালাম দিতেন এবং বলতেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
◈ ১২) রাসূলের কোলে শিশুদের প্রস্রাব:
উম্মে কায়স বিনতে মিহসান থেকে বর্ণিত, তিনি তার দুগ্ধপোষ্য শিশুকে নিয়ে রাসূলের দরবারে এলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে তার কোলে রাখলে, সে তার কোলে প্রস্রাব করে দিলো।
তারপর তিনি পানি নিয়ে আসতে বললেন এবং পানি ছিটিয়ে দিলেন এবং তা ধৌত করেন নি। (সহিহ বুখারি)
◈ ১৩) বড়দের ওপর শিশুদের অগ্রাধিকার দেয়া:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ডান পাশের শিশু ছেলেকে বড়দের আগে শরবত দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে সাহল ইবনে সা’দ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট এক পেয়ালা শরবত আনা হল। তার থেকে তিনি শরবত পান করলেন এবং তার ডান পাশে ছিল দলের সবচেয়ে ছোট একটি ছেলে, আর বড়রা ছিল তার বাম পার্শ্বে। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “হে ছেলে, তুমি কি আমাকে অনুমতি দেবে যে, আমি তা বড়দের আগে দেব?”
ছেলেটি বলল, “হে আল্লাহর রাসূল, আপনার অনুগ্রহ লাভের ব্যাপারে আমি অন্য কাউকে আমার উপর প্রাধান্য দেব না।”
অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকেই প্রথমে দিলেন। (সহিহ বুখারি)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি ছেলেটিকে বললেন: “তুমি কি আমাকে অনুমতি দিবে এদের দেয়ার।”
ছেলেটি বলল, “না। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল, আপনার কাছ থেকে কিছু লাভ করার ব্যাপারে অন্য কাউকে প্রাধান্য দেব না।”
বর্ণনাকারী বলেন অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে তা রাখলেন।”
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রকৃত অনুসারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আরও পড়ুন:
উৎস: প্রেরণার বাতিঘর প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
▬▬▬◍❂◍▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *