Uncategorized

স্ত্রীর নিকটে স্বামীর হক

স্ত্রীর নিকটে স্বামীর হক

স্বামীর উপরে স্ত্রীর যেমন হক আছে, তেমনি স্ত্রীর উপরেও স্বামীর হক আছে। স্ত্রী এসব হক বা অধিকার যথাযথভাবে আদায় করলে সংসার সুখের হবে। তাদের মাঝে কখনো কোন অশান্তি বাসা বাঁধতে পারবে না। নিম্নে কয়েকটি হক উল্লেখ করা হ’ল।-

১. স্বামীর অপসন্দনীয় কাউকে বাড়ীতে প্রবেশ করতে না দেওয়া :

স্বামী অপসন্দ করে এমন কোন লোককে বাড়ীতে বা নিজের কাছে প্রবেশ করতে দেওয়া স্ত্রীর জন্য উচিত নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَلَكُمْ عَلَيْهِنَّ أَنْ لاَ يُوْطِئْنَ فُرُشَكُمْ أَحَدًا تَكْرَهُوْنَهُ– ‘তাদের প্রতি তোমাদের অধিকার এই যে, তোমরা যাদেরকে পসন্দ কর না তারা যেন সেসব লোককে দিয়ে তোমাদের বিছানা না মাড়ায়’।[2] অন্যত্র তিনি বলেন, وَلاَ تَأْذَنَ فِى بَيْتِهِ إِلاَّ بِإِذْنِهِ، ‘স্বামীর অনুমতি ব্যতীত অন্য কাউকে তার গৃহে প্রবেশ করতে দেবে না’।[1]

২. স্বামীর অনুমতি ব্যতীত নফল ছিয়াম না রাখা :

স্বামী উপস্থিত থাকাবস্থায় তার অনুমতি ব্যতীত নফল ছিয়াম রাখা স্ত্রীর জন্য বৈধ নয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ يَحِلُّ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تَصُومَ وَزَوْجُهَا شَاهِدٌ إِلاَّ بِإِذْنِهِ، ‘যখন স্বামী উপস্থিত থাকবে, তখন স্বামীর অনুমতি ব্যতীত মহিলার জন্য (নফল) ছিয়াম পালন করা বৈধ নয়’।[3]

৩. স্বামীর অনুমতি ব্যতীত বাড়ীর বাইরে না যাওয়া :

নারীর কাজ বাড়ীর ভিতরে। তাই বাড়ীর অভ্যন্তরে অবস্থান করা তার কর্তব্য। আল্লাহ বলেন,وَقَرْنَ فِيْ بُيُوْتِكُنَّ وَلاَ تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى ‘আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে। প্রাচীন জাহেলী যুগের ন্যায় সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়িয়ো না’ (আহযাব ৩৩/৩৩)। কোন যরূরী প্রয়োজনে তাকে বাড়ীর বাইরে যেতে হ’লে স্বামীর অনুমতি নিয়ে যেতে হবে এবং শারঈ পর্দা বজায় রেখে যেতে হবে। আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি মুমিন নারীদের বলে দাও, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থান সমূহের হেফাযত করে। আর তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তবে যেটুকু স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায় সেটুকু ব্যতীত। আর তারা যেন তাদের মাথার কাপড় বক্ষদেশের উপর রাখে’ (নূর ২৪/৩১)। রাসূল (ছাঃ) বলেন, إِنَّهُ قَدْ أُذِنَ لَكُنَّ أَنْ تَخْرُجْنَ لِحَاجَتِكُنَّ ‘আল্লাহ প্রয়োজনে তোমাদেরকে বাইরে যাবার অনুমতি দিয়েছেন’।[4]

স্বামীর বিনা অনুমতিতে বাড়ীর বাইরে, পিতার বাড়ী, বোনের বাড়ী, মার্কেট বা অন্য কোথাও না যাওয়া পতিভক্তির পরিচায়ক। এমনকি ছালাত আদায়ের জন্য মসজিদে গেলেও স্বামীর অনুমতি নিতে হবে। মায়ের কোল ছেড়ে বাইরে গেলে যেমন শিশু ঝড়-বৃষ্টি, শীত-গ্রীষ্ম প্রভৃতি দুর্যোগে নিজেকে বিপদে ফেলে, মুরগীর কোল ছেড়ে বাচ্চারা দূরে গেলে যেমন বিভিন্ন হিংস্র প্রাণীর হামলার শিকার হয়, ঠিক তেমনি নারীও স্বামীর নির্দেশ উপেক্ষা করে একাকী বাইরে গেলে নানাবিধ দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার আশংকা থাকে।

ধর্ম-কর্ম ও নৈতিকতাকে কবর দিয়ে অনেক উচ্চশিক্ষিতা মহিলা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে মোটা অংকের টাকা উপার্জন করে। স্বামীর তোয়াক্কা না করে পার্থিব সুখ ভোগ করা বস্ত্তবাদী ও পরকালে অবিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য। পক্ষান্তরে ধর্মীয় নির্দেশ পালন ও নীতি-নৈতিকতা বজায় রেখে পার্থিব কর্তব্য পালন করা পরকালে বিশ্বাসী মুসলিম নারীর একমাত্র বৈশিষ্ট্য। কারণ মুসলমানের মূল লক্ষ্য হ’ল পরকালীন মুক্তি। মুসলিম দু’দিনের সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে পরকাল হারাতে রাযী নয়। সে চায় চিরস্থায়ী আবাস ও অনন্ত সুখের ঠিকানা জান্নাত। এজন্যই নবী করীম (ছাঃ) দো‘আ করতেন,وَلاَ تَجْعَل الدُّنْيَا أَكْبَرَ هَمِّنَا وَلاَ مَبْلَغَ عِلْمِنَا ‘দুনিয়াকে আমাদের বৃহত্তম চিন্তার বিষয় ও আমাদের জ্ঞানের শেষ সীমা (মূল লক্ষ্য) করে দিও না’।[5]

৪. স্বামীকে সম্মান করা ও তার অনুগত থাকা :

স্ত্রীর কাছে স্বামী অতি সম্মান ও মর্যাদার পাত্র। তার সম্মানের কথা হাদীছে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে,لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِغَيْرِ اللهِ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَالَّذِى نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ تُؤَدِّى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤَدِّىَ حَقَّ زَوْجِهَا وَلَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِىَ عَلَى قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعْهُ- ‘যদি আমি কাউকে নির্দেশ দিতাম আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সিজদা করার, তাহ’লে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য। যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ তাঁর কসম! কোন নারী তার প্রতিপালকের হক ততক্ষণ পর্যন্ত আদায় করতে পারবে না যতক্ষণ না সে তার স্বামীর হক আদায় করেছে। সওয়ারীর পিঠে থাকলেও স্বামী যদি তার মিলন চায়, তবে সে বাধা দিতে পারবে না’।[6] অন্যত্র তিনি বলেন,حَقُّ الزَّوْجِ عَلَى زَوْجَتِهِ، أَنْ لَوْ كَانَتْ قَرْحَةٌ فَلَحَسَتْهَا مَا أَدَّتْ حَقَّهُ ‘স্ত্রীর কাছে স্বামীর এরূপ হক আছে যে, স্ত্রী যদি স্বামীর দেহের ঘা চেটেও থাকে তবুও সে তার যথার্থ হক আদায় করতে পারবে না’।[7]

তাই স্বামীর শরী‘আত সম্মত সকল কাজে সহযোগিতা করা এবং তার বৈধ নির্দেশ মেনে নেওয়া স্ত্রীর জন্য আবশ্যক। আল্লাহ বলেন,فَالصَّالِحَاتُ قَانِتَاتٌ حَافِظَاتٌ لِلْغَيْبِ بِمَا حَفِظَ اللهُ– ‘অতএব সতী-সাধ্বী স্ত্রীরা হয় অনুগত এবং আল্লাহ যা হেফাযত করেছেন, আড়ালেও (সেই গুপ্তাঙ্গের) হেফাযত করে’ (নিসা ৪/৩৪)। আর স্বামীর আনুগত্যে অশেষ ছওয়াব রয়েছে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,الْمَرْأَةُ إِذَا صَلَّتْ خَمْسَهَا وَصَامَتْ شَهْرَهَا وَأَحْصَنَتْ فَرْجَهَا وَأَطَاعَتْ زَوْجَهَا فَلْتَدْخُلْ مِنْ أَيِّ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ شَاءَتْ– ‘মহিলা তার পাঁচ ওয়াক্তের ছালাত আদায় করলে, রামাযানের ছিয়াম পালন করলে, লজ্জাস্থানের হিফাযত করলে ও স্বামীর আনুগত্য করলে জান্নাতের যে কোন দরজা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে’।[8]

[1]. মুসলিম হা/১২১৮; ইবনু মাজাহ হা/১৮৫১; মিশকাত হা/২৫৫৫।
[2]. বুখারী হা/৫১৯৫; মুসলিম হা/১০২৬; মিশকাত হা/২০৩১।
[3]. বুখারী হা/৫১৯৫; মুসলিম হা/১০২৬; মিশকাত হা/২০৩১।
[4]. বুখারী হা/৪৭৯৫; মুসলিম হা/২১৭০।
[5]. তিরমিযী হা/৩৫০২; মিশকাত হা/২৪৯২, সনদ হাসান।
[6]. ইবনু মাজাহ হা/১৮৫৩; ছহীহাহ হা/১২০৩।
[7]. ছহীহুল জামে‘ হা/৩১৪৮; আত-তালীকুল হাসান, হা/৪১৫২।
[8]. মিশকাত হা/৩২৫৪, সনদ ছহীহ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *