Description

ধর্ম এবং নীতি শাস্ত্রের পার্থক্য আমাদের মানব সভ্যতায় একটি বিরাট অংশ জুড়ে রয়েছে। পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকে যুগে যুগে কালে কালে মানব সমাজ ধর্ম এবং তাঁর স্বরূপ বোঝার চেষ্টা করে আসছে। শুধু এখানেই সীমাবদ্ধ নয়; মানব সমাজ সবসময় তাঁর সৃষ্টির এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ক্রমবিন্যাসের কারন বুঝতে চেয়েছে এই ধর্মের মাধ্যমে। মানব সৃষ্টির নিগুড় তত্ত্ব বোঝার এবং তাঁর ব্যাখ্যা সংশ্লিষ্ট কারন বোঝার চেষ্টা করেছে এই ধর্মের মাধ্যমে।

বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা আর্নল্ড জে টয়েনবি মানব ইতিহাসের বিস্তার নিয়ে চর্চা করতে গিয়ে বিশদভাবে ধর্ম এবং স্রষ্টা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন এবং তাঁর সমগ্র গবেষণা তিনি তাঁর দশটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। তবে আমার উদ্দেশ্য তাঁর গ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করা নয়। আমার উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্মের উদ্ভাবক অর্থাৎ স্রষ্টার কিংবা আমাদের পালনকর্তার কথাগুলো বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে কিভাবে বলা হয়েছে কিংবা কি বলা হয়েছে তা সর্বাধিক সহজ ভাষায় তুলে ধরা (অবশ্যয় রেফারেন্স সহকারে)। তবে আমি আমার উদ্দেশ্য সফল করতে টয়েনবির পদ্ধতি অনুসরন করতে পারি। সে যেভাবে মানব ইতিহাসের ধর্মগুলোকে কেন্দ্রীভূত করে সংক্ষিপ্ত করেছিলেন আমিও ঠিক সেই পদ্ধতি অনুসরন করবো। ১৯৫৪ সালের ২৪ শে অক্টোবর তিনি ‘’দ্য অবজারভার’’ নামক একটি অনুচ্ছেদে লিখেছিলেনঃ

আমি একটি বিশ্বাসে ফিরে এসেছি; আর তা হলো ধর্ম সকল অস্তিত্তের রহস্য ধারন করে। আসুন শুরু করা যাক।

অক্সফোর্ড অবিধান অনুসারে, ধর্ম হলো আনুগত্য ও উপাসনার মাধ্যমে এক ঈশ্বর (আল্লাহ্‌) কিংবা একাধিক ঈশ্বরসমূহের অতি মানবিক নিয়ন্ত্রণশক্তিতে বিশ্বাস। তবে প্রতিটি ধর্মেরই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। এরকম একটি বৈশিষ্ট্য হলো, প্রতিটি ধর্মেরই একজন সার্বজনীন ঈশ্বর বা একটি ঐশ্বরিক ক্ষমতায় বিশ্বাস যা অসীম ক্ষমতা সম্পন্ন ও সর্বজ্ঞ। প্রতিটি ধর্মের লোকজনই বিশ্বাস করেন যে, তাদের ধর্ম কিংবা তাঁরা যে ঈশ্বরের বিশ্বাসী সেটাই সার্বজনীন এবং সত্য। আর এভাবেই যুগ যুগ ধরে ধর্ম মানব অস্তিত্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে আছে।ধর্ম ভিত্তিক বইগুলোকে প্রচলিত অর্থে ‘’কিতাব’’  বলা হয়ে থাকে। আর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভুল কিতাব হলো মুসলমানদের ‘’আল-কুরআন’’ । ’আল-কুরআন’’  এর অধ্যায় (সুরাহ আন-নিসা) ৪ এবং আয়াত ৬৪ তে বলা হয়েছেঃ

‘’ বলুন, হে কিতাবের অনুসারীরা! আমাদের আর তোমাদের মাঝে যে বিষয়টি সবচেয়ে বড় পার্থক্য সৃষ্টি করে তা হলো এই যে, আমরা আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কারও দাসত্ব করবো না এবং তাঁর সাথে অন্য আর কাউকেও শরীক করবো না, আমরা আর কাউকেও আমাদের রব বানাবো না। যদি তাঁরা এই কথা না মানে, তবে বলে দাও যে, তোমরা সাক্ষী থাকো আমরা মুসলিম।‘’

বিভিন্ন ধর্মসমূহের অধ্যায়ন আমার কাছে অত্যন্ত চমকপ্রদ অভিজ্ঞতা। ঈশ্বর প্রতিটি মানবাত্মাকে ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারনা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এই বিশ্বাসটিকে মজবুতভাবে আরও আমাদের মনকে গভীরে প্রোথিত করে ধর্মসমুহের বিশ্বাস এর ওপর। মানুষের মানবিক গঠনই এমন যে, সে সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বকে গ্রহণ করে যদি না সে বিতর্কিত বিশ্বাসে বিশেষভাবে প্রভাবিত না হয়। অন্যদিকে ঈশ্বরে বিশ্বাস এর জন্য কোন শর্তের প্রয়োজন হয় না, অন্যদিকে নাস্তিকদের জন্য শর্তের প্রয়োজন হয়।

বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মসমূহ

গোটা বিশ্বের ধর্ম সমুহকে প্রধানত দুটিভাগে বিন্যস্ত করা যায়। একটি হল সেমেটিক ধর্ম এবং অন্যটি হলো নন-সেমেটিক ধর্ম। নন- সেমেটিক ধর্মকে আবার আর্য্ এবং অনার্য্ এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

সেমেটিক ধর্মসমূহ

সেমেটিক শব্দের উদ্ভব সেমিট, সেমেটিক জনগণ কিংবা সেমেটিক সংস্কৃতিথেকে। সেমেটিক শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহৃত হয় ১৭৭০ সালে একদল ইতিহাস পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে। শব্দটির উদ্ভব ঘটেছে ‘’সেম’’ শব্দ থেকে। পবিত্র বাইবেল অনুযায়ী হযরত নূহ (আঃ) এর এক সন্তানের নাম ছিল সেম। সেম’এর বংশধররায় সেমেটিক নামে পরিচিত। সুতরাং সেমেটিক ধর্ম বনী ইসরাইল তথা ইহুদী, আরবীও, ফিনিশিয়দের মধ্যে উদ্ভাবিত ধর্ম। প্রধান সেমেটিক ধর্মগুলো হচ্ছে ইহুদী ধর্ম, খৃস্টান ধর্ম এবং ইসলাম ধর্ম। এই প্রতিটি ধর্মের কিছু উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য দেখা যায়।

Different System of Worship in Different Religion

এই ধর্মগুলোয় বিশ্বাসী সকল জনগণ একেশ্বরবাদী মতের ওপর দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করে থাকে,তাদের বিশ্বাসের একটি শক্ত ভিত্তি হচ্ছে তাঁরা না দেখা এক ঈশ্বর এর কথায় বিশ্বাস স্থাপন করে,এই ধর্মের প্রতিটি জনগণ ভবিষ্যৎ বাণীতে পরিপূর্ণ কিতাব এবং ঈশ্বর প্রেরিত নবী-রাসুল গনের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখে।

নন-সেমেটিক ধর্মসমূহ

নন সেমেটিক ধর্ম সমূহকে আবার আর্য্ এবং অনার্য্ এই দুই উপ-শ্রেণীতে বিভক্ত করা হয়েছে। এখন আমরা এই দুই উপ শ্রেণী নিয়ে কথা বলবো।

আর্য্ ধর্মঃ

আর্য্ মূলত একটি জাতি গোষ্ঠীর নাম। এই জাতির জনগণ ইন্দো-ইউরোপিয়ান জাতির একটি শক্তিশালী গোত্র। ধারনা করা হয়, দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধের দিকে এই জাতির জনগণ ইরান এবং উত্তরে ভারতীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। আর এই জাতি গোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত ধর্মের নাম হচ্ছে আর্য্ ধর্ম। এই আর্য্ ধর্মকে আবার বৈদিক এবং অবৈদিক এই দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। এই আর্য্ ধর্মের দুইটি উদাহরণ হল হিন্দু এবং ব্রাহ্ম ধর্ম। আর অনার্য্ ধর্মের উদাহরণ হল শিখ, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্ম। অধিকাংশ আর্য্ এবং অনার্য্ ধর্মের লোকজন সাধারনত কোন ভবিষ্যৎবানী এবং সর্ব শক্তিমান ঈশ্বর প্রদত্ত কোন কিতাবের জ্ঞান রাখে না।

অনার্য্ ধর্মঃ

অনার্য্ ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন উৎপত্তিস্থল রয়েছে। কনফুসিয়াজম এবং তাইওজম ধর্ম এসেছে চীন দেশ থেকে। অন্যদিকে, শিন্টইজিম ধর্ম এসেছে জাপান থেকে। অধিকাংশ অনার্য ধর্মে ঈশ্বরের ধারনা অনুপস্থিত। এই ধর্মে মূলত ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস স্থাপনের চেয়ে নৈতিক শাস্ত্রের গুরুত্ব বেশী দেয়া হয়েছে। অনার্য ধর্ম বাদে কোন ধর্মেই মনুষ্য জাতির ধর্ম চর্চাকে কেন্দ্র করে ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণাকে সমর্থন করা হয় না। এটা খুবই স্বাভাবিক যে যদিও অধিকাংশ ধর্মের ধর্ম গ্রন্থ থাকা সত্ত্বেও সেই ধর্মের অনুসারীরা ঈশ্বরের ধারণা সম্পর্কে অজ্ঞ। সুতরাং যেকোনো ধর্মের ধর্মগ্রন্থে উল্লেখিত ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণা বিশ্লেষণ করায় হবে সর্বাধিক উত্তম কাজ।

Reviews (0)

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “প্রসিদ্ধ ধর্মগুলোতে স্রষ্টার ধারণা”

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping cart
Facebook Twitter Instagram YouTube WhatsApp WhatsApp

Sign in

No account yet?