Description

অসীম মর্যাদাপূর্ণ রজনী লাইলাতুল ক্বদর। একই সাথে ‘কদর অনুসন্ধানের মাধ্যম ই’তিকাফ যা কিনা পবিত্র রামাদান মাসের শেষ দশকে শুরু হয়। সিয়াম নির্দেশিকা বইটিতে মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল ক্বদর ও ই’তিকাফ নিয়ে লেখা অধ্যায় দু’টি পড়ে আমার মনে হলো, এ বিষয়গুলো সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে পত্রিকায় আসা প্রয়োজন। কারণ সবাই জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে বই পড়েন না। বিশেষ করে ইসলামী বই, লাইলাতুল ক্বদর ও ইতিকাফ সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদীসের দলিল প্রমাণ এবং সাহাবা (রাঃ)দের ও বিশিষ্ট ফিকাহবিদগণের মতামত লেখক অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় দক্ষতার সাথে এ বইটিতে উপস্থাপন করেছেন। যে কারণে নিজে না লিখে বিশুদ্ধ সিয়াম নির্দেশিকা বইটির এই দু’টি অধ্যায় দৈনিক নয়া দিগন্তের ইসলামী পাতায় এবং দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকার নারী পাতায় পাঠালাম। নয়া দিগন্তের ইসলামী পাতার সম্পাদক সাহেব রামাদান সম্পর্কিত কোন লেখা তার পাতায় প্রকাশিত হওয়ার এখন আর সুযোগ নেই বলে, তিনি ইতিকাফ সম্পর্কিত লেখা পাঠাতে বললেন। ইতিকাফ সম্পর্কে এত তথ্য প্রমাণসহ লেখা থাকতে নিজে লেখার প্রেরণা পেলাম না। আবার লাইলাতুল ক্বদর অধ্যায়টিও উপেক্ষা করা যায় না বিধায় দু’টি লেখাই দু’টি পত্রিকায় পাঠিয়েছি, বাকি আল্লাহ্র ইচ্ছা। লেখকের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এখানে লেখকের নাম ও বইয়ের নাম হেডলাইন দেয়া হয়েছে। -সাইয়্যেদা সুরাইয়া

মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল ক্বদর : লাইলাতুল ক্বদর তথা মহিমান্বিত রজনী। এ রজনীকে ক্বদরের রজনী বলার কারণ এই যে, এ রজনীর শ্রেষ্ঠত্ব ফযীলত ও বরকত অন্যান্য সকল রাত্রির অপেক্ষা বহুগুণে বেশি। দ্বিতীয়ত এ রজনীতে পরবর্তী এক বছরের জীবন মৃত্যু, ধন সম্পদ লিপিবদ্ধ করা হয়। ইতিপূর্বে তাদের লেখিত ভাগ্য বণ্টনের সেই দফতর (লাওহে মাহফুয) থেকে। (যুবদাতুত তাফসীর ৮১৫ পৃ: তাইসীরুল কারীম সা’দ প্রণীত ২য় খণ্ড ১২৯৮ পৃ.)

এই রজনীটি মহান প্রতিপালক আল্লাহ্ তা’তালার পক্ষ হতে তাঁর মু’মিন বান্দাদের প্রতি বিশেষ অবদান। বিশেষ করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্য। এই রজনী লাভের ফলে তাদের বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তা অন্যান্য নবীর উম্মতদের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ফযীলত : ১. মহান রাব্বুল আলামীন বিশ্ব মানবের হিদায়াত ও পথ নির্দেশিকা মহাগ্রন্থ আল কুরআন এ রজনীতেই লাওহে মাহফুয থেকে ১ম আসমানে সম্পূর্ণরূপে অবতীর্ণ করেছেন। অতঃপর সুদীর্ঘ তেইশ বছর যাবৎ প্রয়োজন অনুসারে বিশ্বনবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। (ইবনু কাছীর ৪র্থ খ- ৫৬৬ পৃ.)

২. এ রজনী এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।

৩. এতে ধরণীর বুকে অসংখ্য ফেরেস্তা অবতীর্ণ হন।

৪. এ রজনীতে অধিকরূপে শান্তি নাযিল হয়।

৫. এর ফযীলতার্থে বিশেষ একটি সূরা অবতীর্ণ করা হয়েছে যা কিয়ামত পর্যন্ত তেলাওয়াত করা হবে। যার নাম সূরা আল ক্বাদর।

৬. একটি রজনী নফল ইবাদতের ফলে মু’মিনদের অতীতের ক্ষুদ্র পাপসমূহ ক্ষমা করে দেয়া হয়।

উপরোক্ত ফযীলতসমূহে নিম্নোক্ত দলিল প্রযোজ্য।

প্রথমত আল্লাহ্ তা’আলার পবিত্র বাণী :

ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ : মহান আল্লাহ্ বলেন, (৩) আমি এ কুরআনকে এক বরকতময় রজনীতে (লাইলাতুল ক্বদরে) অবতীর্ণ করেছি, অবশ্যই আমি তদ্বারা মানব জাতিকে শিরক ও নাফরমানী থেকে সতর্ককারী (৪) এ রজনীতে (লাওহে মাহফুয থেকে অপরিবর্তনীয় সকল বস্তু (মৃত্যু, রিযিক, আমল, সম্পদ) পুনঃস্থির করা হয়। (৫) যা কিছু হবে তা কেবল আমার আদেশক্রমে, আমিই মানব জাতির জন্য রাসূল প্রেরণকারী। (সূরা আদ্দুখান: ৩-৫, ইবনু কাছীর উক্ত সূরা ৪র্থ খ- ১৪৮ পৃ., যুবদাহ ৬৫৬ পৃ. তায়সীর ২য় খ. ১০৭২ পৃ.)

মহান স্রষ্টা আরো বলেছেন: ইরশাদ হচ্ছে, আমি (লাওহে মাহফুয থেকে প্রথম আসমানে) এ মহীয়সী রজনীতে কুরআনুল কারীম অবতীর্ণ করেছি। আপনি কি (হে রাসূল) অবগত আছেন যে, ঐ মহীয়সী রজনী কি? মহিমান্বিত রজনী হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। (তথা উক্ত রজনীতে ক্বিয়াম ও ইবাদত এক হাজার মাস কিয়াম ও ইতাবদের চেয়ে উত্তম) এ রজনীতে ফজর প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত ফেরেস্তা ও জিবরীল (রাঃ) তাদের প্রভুর অনুমতিক্রমে শান্তি, সর্বপ্রকার আদেশসহ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। (সূরা আল- ক্বাদর), (ইবনু কাছীর ৪র্থ খ. ৫৮৬-৫৮৭ পৃ., যুবদাহ ৮১৫ পৃ.)।

এ একটি রাত ইবাদত করলে এক হাজার মাস (৮৩ বছর ৪ মাস) অপেক্ষা অধিক পরিতোষিক বা ছাওয়াব অর্জিত হবে, ইনশাআল্লাহ্। এ অতুলনীয় ফযীলত ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভে ধন্য হবেন তারাই যারা প্রকৃত মু’মিন তথা সর্বপ্রকার শিরক, কুফর, বিদআত, নিফাক্ব ও অবৈধ অর্থ উপার্জন ও ভক্ষণ থেকে মুক্ত রয়েছেন এবং যারা ফরয ছালাতসহ অন্যান্য ফরয ইবাদতগুলো যথারীতি সঠিকভাবে আদায় করেন। (এ পর্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে সিয়ামের শিক্ষায়)।

দ্বিতীয়ত: রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের বাণী :

বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি খাঁটি ঈমানসহ (তথা শিরক মুক্ত হয়ে) কেবল প্রতিদান লাভের প্রত্যাশায় ক্বদরের রজনী *ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে (এর ফলে) তার পূর্ববর্তী সকল ছোট পাপ মার্জি হয়ে যাবে। (বুখারী ও মুসলিম)

লাইলাতুল ক্বদর কোনটি?

এ মর্মে বিভিন্নরূপ হাদীস রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম হতে সাব্যস্ত রয়েছে। যা নিম্ন বর্ণিত হাদীসসমূহের মাধ্যমে অবহিত হওয়া যায়।

প্রথমত: উহা রমযানের শেষ দশকে, যেমন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, তোমরা ঐ মহিমান্বিত রাতটি রমযানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর। (বুখারী ও মুসলিম)

উক্ত হাদীসে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশককে জোড় বেজোর নির্বিশেষে সকল রাতের মাঝেই অনুসন্ধান করতে বলেছেন।

দ্বিতীয়ত: উহা জোড় রাত অপেক্ষা বেজোড় রাত হওয়াটাই অধিক নিকটবর্তী। যেমন : নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, তোমরা ঐ সম্মানিত রাতটি রামাদানের শেষ দশকে বেজোড় রাত্রিসমূহে অনুসন্ধান কর। (বুখারী)

তৃতীয়ত: উহা শেষ সপ্তমে অনুসন্ধান নিকটতম।

আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) আনহুমা হতে বর্ণিত যে, একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম-এর কতিপয় ছাহাবীকে ‘লাইলাতুল ক্বাদর’ শেষ সপ্তম রজনীতে স্বপ্নে দেখান হলো, অতঃপর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, আমি দেখতে পাচ্ছি শেষ সপ্তমে তোমাদের সকলের সম্য একই ধরনের হয়েছে যে, রজনী পেতে ইচ্ছুক সে যেন উহা শেষ সপ্তম রজনীতে অনুন্ধান করে (বুখারী ও মুসলিম)

চতুর্থত: শেষ সপ্তামের বেজোড় সংখ্যার সাথে সাতাইশ রজনী অধিক নিকটবর্তী।

উবাইয়া বিন কা’ব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, যে রজনীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে কিয়াম করতে (তাহাজ্জুত পড়তে) নির্দেশ দিয়েছিলেন আল্লাহ্র কছম আমি উহা সম্পর্কে অবহিত আছি। তা হলো ২৭শে রজনী। (মুসলিম)

আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি উহা অর্জন করতে ইচ্ছুক সে যেন ২৭শে রজনীতে অনুসন্ধান করে। (ইমাম আহমাদ হাদীসটিকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন)।

পঞ্চমত: ঐ মহিমান্বিত রজনী স্থানান্তরশীল তথা প্রতি বছর একই তারিখে বা রজনীতে সংগঠিত হয় না। বরং এক বছর ২৭শে রজনীতে সংগঠিত হলে পরবর্তী বছর ২৫শে তৎপরবর্তী বছর ২৩শে বা ২১শে এভাবে পবিবর্তন হয়ে থাকে মহান আল্লাহ্র আদেশে ও তার হিকমতের ফলে, এ অনির্দিষ্ট নির্দেশনা নিম্নবর্ণিত হাদীসের দ্বারা অর্জিত হয়। যথা:

আবদুল্লাহ্ বিন আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, (রমযানের শেষ দশকের) যখন নবম রজনী, সপ্তম রজনী, পঞ্চম রজনী অবশিষ্ট থাকে তখন ঐ রজনী অনুসন্ধান কর। (বুখারী শরীফ)

আল্লামা ইবনু হাজার আসক্বালনী (রহঃ) বলেছেন যে, আমি উহাকে শেষ দশকের বেজোড় রজনীসমূহে প্রাধান্য প্রদান করি এবং উহা পরিবর্তনশীল। (ফাতহুল বারী ৪র্থ ভ. ২৬৬ পৃ.) আল্লাম্মা ইবনু উছাইমীন উক্ত অভিমত প্রকাশ করেছেন (মাজালিশ ২৫৪ পৃ.)

আল্লাহ্ সুবানাহু ওয়া তা’আলা তার বান্দাদের প্রতি উক্ত মহিমান্বিত রজনী অপ্রকাশ্য রেখেছেন সম্ভবত নিম্নবর্ণিত কোন কারণে :

১. বান্দা যেন রজনী অনুসন্ধান কল্পে সকল বেজোড় রাতসমূহে ইবাদত করে স্বীয় পাপ মোচন করতে পারে, অধিক ছাওয়াব অর্জন করতে পারে এবং আমল বৃদ্ধি করে আল্লাহ্র নৈকট্য লাভে ধন্য হতে পারে। নিঃসন্দেহে এটা তাঁর বান্দাদের প্রতি এক অনন্ত করুণার বহিঃপ্রকাশ।

২. পরীক্ষাস্বরূপ অপ্রকাশ্য রেখেছেন। অর্থাৎ কোন বান্দা উক্ত রাত্রি প্রাপ্তির মানসে চরম ত্যাগ তিতীক্ষা ও চেষ্টা সাধনার মাধ্যমে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করবে, আর কোন বান্দা অলসতাবশত: চেষ্টা বিমুখ হয়ে নিদ্রায় কাটাবে। এটা পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে।

মহিমান্বিত রজনীর আলামতসমূহ :

১. উক্ত রাত্রি তিমিরাচ্ছন্ন হবে না।

২. নাতিশীতোষ্ণ হবে (না গরম না শীত এমন)

৩. মৃদুমন্দ বায়ু প্রবাহিত হবে।

৪. উক্ত রাতে মু’মিনগণ কিয়ামুল লাইল বা ইবাদত করে অন্যান্য রাত অপেক্ষা অধিক তৃপ্তি বোধ করবে।

৫. হয়তো বা আল্লাহ্ কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে উহা স্বপ্নে দেখাবেন।

৬. ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।

৭. সকালে হালকা আলোকরশ্মি সূর্যোদয় হবে, পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায়।

দেখুন: (১নং আলামত হতে ৫নং পর্যন্ত) ছহীহ ইবনু খুয়ায়মা ২১৯০ নং হাদীস, ছহীহ ইবনু হিব্বান ৩৬৮৮ নং হাদীছ, মুসনাদে আহমাদ ৫ম খ. ৩২৪ পৃ. মাজমায়ুল হায়ছামী ৩য় খ. ১৭৫ প. আল বাযযার ১০৩৪নং হাদীস (৬ নং) বুখারী শরীফ ২০২১ নং হাদীস এবং (৭নং) মুসলিম শরীফ ৭৬২ নং হাদীস।

মুসলিম ব্যক্তি কিভাবে লাইলাতুল ক্বদর (মহিমান্বিত রজনী) অতিবাহিত করবেন?

নিঃসন্দেহে ঐ রবকতপূর্ণ রাতটি যে ব্যক্তি অবহেলায় বা অলসতায় অমূল্যায়ন করল, এর যথার্থ গুরুত্ব আরোপ করলো না সে সমূহ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হল আহমক ও নির্বোধগণই যাবতীয় কল্যাণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত যে, ঐ রাতের যথাযথ হক্ব আদায় করে মহান প্রভুর পক্ষ থেকে কল্যাণ ফযীলত, বরকত ও আশাতীত ছাওয়াব লাভে ধন্য হওয়া।

অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ্ আপনি অধিক ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমাকে ভালোবাসেন, সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন।

আল্লাহ্ আমাদের সকলকে লাইলাতুল ক্বদরের যথাযথ মূল্যায়ন ও এর হক আদায় করে অশেষ সাওয়াব হাসিল করার তাওফিক দান করুন। (সংকলিত)

-যাকারিয়া বিন ইন্তাজ আলী

লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

Reviews (0)

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “বিশুদ্ধ সিয়াম নির্দেশিকা”

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shopping cart
Facebook Twitter Instagram YouTube WhatsApp WhatsApp

Sign in

No account yet?